
অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৫, ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকাদের মঞ্চ, এবার তার চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন সেমি-ফাইনালিস্টদের দিকে। চারটি মহাদেশীয় শক্তি – অস্ট্রিয়া (Austria U17), ইতালি (Italy U17), পর্তুগাল (Portugal U17) এবং ব্রাজিল (Brazil U17) – তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনাল জয় করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। এই নিবন্ধে, আমরা এই চারটি ম্যাচের ফলাফল বিশ্লেষণ করব এবং সেমি-ফাইনালে ওঠা দলগুলোর খেলার ধরন ও সাফল্যের কারণ অনুসন্ধান করব।
কোয়ার্টার ফাইনালের চারটি ম্যাচই ছিল আক্রমণ এবং কৌশলের এক দারুণ মিশ্রণ। প্রতিটি দলই নিজ নিজ বিশেষত্ব দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছে।
| ম্যাচ | বিজয়ী দল | ফলাফল | ম্যাচের প্রকৃতি |
| অস্ট্রিয়া বনাম জাপান | অস্ট্রিয়া U17 | ১-০ | রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা বনাম বল পজেশন |
| ইতালি বনাম বুরকিনা ফাসো | ইতালি U17 | ১-০ | কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বনাম আফ্রিকান গতি |
| পর্তুগাল বনাম সুইজারল্যান্ড | পর্তুগাল U17 | ২-০ | আক্রমণাত্মক আধিপত্য ও কার্যকরী ফিনিশিং |
| মরক্কো বনাম ব্রাজিল | ব্রাজিল U17 | ২-১ | শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা ও অভিজ্ঞতা |
ফলাফল: অস্ট্রিয়া ১ – ০ জাপান
এই ম্যাচটি ছিল আক্রমণের চাপ এবং কার্যকর প্রতি-আক্রমণের এক দারুণ উদাহরণ। জাপান তাদের চিরাচরিত ফুটবলের ধরনে ৫৯% বল পজেশন ধরে রেখেছিল এবং মোট ১২টি শট নিয়েছিল। এমনকি তারা অস্ট্রিয়ার (৮টি) চেয়ে বেশি ১০টি কর্নারও পেয়েছিল। কিন্তু ফুটবলে শুধু বলের দখলই শেষ কথা নয়, শট অন টার্গেটের গুরুত্বই এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। অস্ট্রিয়া, তুলনামূলকভাবে কম বল ধরেও, জাপানের ৪টির বিপরীতে ৫টি শট অন টার্গেট নিয়েছিল।
অস্ট্রিয়ান কোচিং স্টাফের ৪-২-৩-১ কৌশল রক্ষণকে শক্তিশালী রেখেছিল। খেলার ৪৯ মিনিটে জোহানেস মোসারের একমাত্র গোলটিই সেমি-ফাইনালে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়। জাপানের আক্রমণাত্মক ৩-৪-৩ কৌশল অস্ট্রিয়ার ডিফেন্স এবং গোলরক্ষককে ভেদ করতে পারেনি। এই জয় প্রমাণ করে, বড় টুর্নামেন্টে রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা এবং সুযোগ কাজে লাগানো কতটা জরুরি।
ফলাফল: ইতালি ১ – ০ বুরকিনা ফাসো
ইতালি, তাদের ৪-৩-১-২ ফর্মেশনে খেলা, এই ম্যাচে সম্পূর্ণভাবে আধিপত্য বিস্তার করে। তারা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় (৬৩%) বল নিজেদের পায়ে রাখে, যা তাদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। ইতালির খেলোয়াড়রা এই বয়সের ফুটবলেও পাসের নির্ভুলতা এবং প্রতিপক্ষের অর্ধ্বে খেলার প্রবণতা দেখায়।
যদিও তারা মোট শটের ক্ষেত্রে (৭ বনাম ৮) বুরকিনা ফাসোর থেকে সামান্য পিছিয়ে ছিল, কিন্তু শট অন টার্গেটের ক্ষেত্রে ইতালি ছিল অনেক এগিয়ে (৫ বনাম ২)। এর অর্থ হলো, ইতালীয় শটগুলি ছিল অনেক বেশি লক্ষ্যভেদী এবং বিপজ্জনক। ৮৩ মিনিটে থমাস ক্যাম্পানিয়েলোর একমাত্র গোলটি আসে, যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছে। বুরকিনা ফাসোর ৪-২-৩-১ ফর্মেশন আফ্রিকান গতি এবং শক্তি নিয়ে লড়াই করলেও, ইতালির অভিজ্ঞ এবং সুসংগঠিত ডিফেন্সকে ভাঙতে ব্যর্থ হয়। এই জয় ইতালীয় ফুটবলের রক্ষণাত্মক ঐতিহ্যের ঝলক দেখায়।
আরও পড়ুনঃ
ফিফা র্যাঙ্কিং ২০২৫: নভেম্বরে বাংলাদেশ ও ব্রাজিল পেল সুখবর
ট্রয় প্যারটের হ্যাটট্রিকে আয়ারল্যান্ডের বিশ্বকাপ প্লে-অফ নিশ্চিত
ফলাফল: পর্তুগাল ২ – ০ সুইজারল্যান্ড
এই কোয়ার্টার ফাইনালটি ছিল সবচেয়ে একতরফা ম্যাচগুলোর মধ্যে একটি। পর্তুগাল তাদের ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়, যেখানে সুইজারল্যান্ডের ৪-২-৩-১ ফর্মেশন তাদের থামাতে ব্যর্থ হয়। পর্তুগাল ৫৬% বল পজেশন ধরে রাখে এবং শট, শট অন টার্গেট ও কর্নার—সবক্ষেত্রেই সুইজারল্যান্ডের তুলনায় স্পষ্টভাবে এগিয়ে ছিল।
পর্তুগাল মোট ১২টি শট নেয়, যার মধ্যে ৬টিই ছিল অন টার্গেট, যা তাদের আক্রমণের কার্যকারিতার প্রমাণ। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ড ৯টি শট নিলেও, মাত্র ৩টি শট অন টার্গেট করতে পেরেছিল। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টগুলিও পর্তুগালের আধিপত্যের ইঙ্গিত দেয়:
৪১ মিনিটে: মাতেউস মাইডের গোল।
৫৩ মিনিটে: জোসে নেটোর গোল।
দ্রুত দুটি গোল করে পর্তুগাল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সুইজারল্যান্ডের কাছে আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। পর্তুগালের এই পারফরম্যান্স সেমি-ফাইনালে তাদের ফেভারিট হিসেবে প্রমাণ করে।
ফলাফল: মরক্কো ১ – ২ ব্রাজিল
লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল এই ম্যাচেও তাদের স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতাকে কাজে লাগায়। তারা ৬৩% বল পজেশন ধরে রেখে মোট ১০টি শট নেয়, যা মরক্কোর (৩টি শট) তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু মরক্কো প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্রাজিলের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।
ব্রাজিল প্রথমে ১৬ মিনিটে ডেলের গোলে এগিয়ে গেলেও, মরক্কোর জিয়াদ বাহার পেনাল্টি থেকে ৪৪ মিনিটে সমতা ফেরান। ১-১ স্কোরে বিরতিতে যাওয়ার পর মরক্কো তাদের ৪-১-৪-১ ফর্মেশনে ব্রাজিলকে আটকে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু, অভিজ্ঞতা এবং প্রতিভার ঝলক শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের পক্ষেই যায়। খেলার শেষ মুহূর্তে, ৯০+৫ মিনিটে, ডেল আবারও গোল করে সেলেসাওদের জন্য একটি নাটকীয় জয় নিশ্চিত করেন। ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলা ব্রাজিল প্রমাণ করে যে, তারা শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত এবং বড় টুর্নামেন্টে চাপের মুখেও গোল করার ক্ষমতা রাখে।
এই চারটি দলই তাদের নিজ নিজ উপায়ে জয় লাভ করেছে—অস্ট্রিয়া এবং ইতালি কঠিন রক্ষণ এবং কার্যকর সুযোগ কাজে লাগানোর মাধ্যমে; পর্তুগাল আক্রমণাত্মক আধিপত্যের মাধ্যমে; এবং ব্রাজিল শেষ মুহূর্তের মানসিকতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সেমি-ফাইনালে এই চারটি শক্তির লড়াই দেখতে মুখিয়ে আছে বিশ্ব ফুটবল।