
ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আগেই আইসিসির কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে সন্তোষজনক কোনো নিশ্চয়তা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। একই ধরনের অনিশ্চয়তায় রয়েছে পাকিস্তানও—তাদের অংশগ্রহণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে মনে পড়ে যায়, অতীতে একাধিকবার নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে আইসিসি টুর্নামেন্টে আয়োজক দেশে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিভিন্ন দল। ইতিহাসে এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার দিকে এক নজর দেওয়া যাক—
১৯৯৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের সময় শ্রীলঙ্কায় চলছিল তীব্র গৃহযুদ্ধ। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক দুই সপ্তাহ আগে কলম্বোয় ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ চরমে পৌঁছে।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপ, দুঃখ প্রকাশ স্কটল্যান্ডের
যদিও সহ-আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কার প্রতি সংহতি জানিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ একাদশ কলম্বোয় একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল, তবে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের গ্রুপ ম্যাচ খেলতে সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলস্বরূপ ম্যাচ দুটি শ্রীলঙ্কাকে ওয়াকওভার হিসেবে দেওয়া হয় এবং পয়েন্ট হারায় দুই দলই।
অবশেষে সব বাধা পেরিয়ে শ্রীলঙ্কা ফাইনালে উঠে লাহোরে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয়।
২০০৩ সালে আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত বিশ্বকাপে সহ-আয়োজক ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া। সেই আসরে দুটি বড় দল আয়োজক দেশে খেলতে রাজি হয়নি।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ইংল্যান্ড হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জন করে। তখন যুক্তরাজ্য সরকার রবার্ট মুগাবে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিল।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে নিউজিল্যান্ড নাইরোবিতে কেনিয়ার বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। এর আগে মোম্বাসায় ঘটে যাওয়া বোমা হামলা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দুই দলই ম্যাচ অন্য ভেন্যুতে সরানোর অনুরোধ করলেও আইসিসি তা নাকচ করে দেয়। ফলে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়াকে ওয়াকওভার দেওয়া হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেনিয়া ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালেও পৌঁছে যায়।
২০০৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয় ভিসা জটিলতা। খেলোয়াড়রা ভিসা পাবেন কি না—এ নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা চলতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত আইসিসি ও জিম্বাবুয়ে বোর্ডের মধ্যে সমঝোতা হলেও জিম্বাবুয়ে টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়। তাদের পরিবর্তে সুযোগ পায় স্কটল্যান্ড।
২০১৫ সালে নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও তারা বাংলাদেশে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।
আইসিসি অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানকে সম্মান জানালেও প্রকাশ্যে হতাশা জানায়। পরে আয়ারল্যান্ড দল অস্ট্রেলিয়ার বদলে টুর্নামেন্টে অংশ নেয়।
দীর্ঘ ২৯ বছর পর পাকিস্তানে আইসিসির কোনো বড় টুর্নামেন্ট ফিরলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—ভারতীয় দল সেখানে যাবে কি না।
ভারত সরকার থেকে অনুমোদন না পাওয়ার কথা জানিয়ে বিসিসিআই পাকিস্তান সফর প্রত্যাখ্যান করে। বহু আলোচনা ও সমঝোতার পর সিদ্ধান্ত হয়, ভারত-পাকিস্তানসহ ভারতের সব ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজন করা হবে। সেই অনুযায়ী ভারতের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয় দুবাইয়ে। শেষ পর্যন্ত ভারতই টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতে নেয়।
এই সব নজিরের আলোকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশেষ কোনো সমাধান আসবে কি না—তা নিয়ে চলছে আলোচনা। বিশ্বকাপ শুরুর সময় ঘনিয়ে আসায় বিসিবি ও আইসিসির চলমান আলোচনার ফলের দিকেই এখন তাকিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব।